দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে সব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেই কিছুটা স্থবিরতা দেখা যাচ্ছে। আবাসন খাতও এর ব্যতিক্রম নয়। এরপরও বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক এ খাতের গ্রাহকদের মাঝে ঋণ বিতরণ করছে।
সাম্প্রতিক আবাসন খাতকে কেমন দেখছেন? এ খাতে বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক কী ধরনের ঋণ প্রদান করছে?
দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে সব অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডেই কিছুটা স্থবিরতা দেখা যাচ্ছে। আবাসন খাতও এর ব্যতিক্রম নয়। এরপরও বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংক এ খাতের গ্রাহকদের মাঝে ঋণ বিতরণ করছে। এক্ষেত্রে রিটেইল কাস্টমারদের জন্য আমাদের দুটি প্রডাক্ট রয়েছে। ‘বেঙ্গল হোম লোন’ এবং ‘বেঙ্গল হোম ফাইন্যান্স’। এর মধ্যে দ্বিতীয়টি শরিয়াহভিত্তিক বিনিয়োগ ব্যবস্থার মাধ্যমে বিতরণ করা হয়। উভয় ক্ষেত্রেই আমরা খুবই প্রতিযোগিতামূলক সুদ বা মুনাফার হার নির্ধারণ করি।
আবাসন খাতে বেঙ্গল কমার্শিয়াল ব্যাংকের ঋণখেলাপির হার কেমন? এক্ষেত্রে কোন শ্রেণীর গ্রাহকরা বেশি খেলাপি হচ্ছেন?
বর্তমানে আমাদের হোম লোন পোর্টফোলিওতে খেলাপির হার প্রায় ১ দশমিক ৮৭ শতাংশ, যা সামগ্রিকভাবে একটি সহনীয় ও নিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে রয়েছে। এ খাতের খেলাপি ঋণে বাড়ি মালিকদের চিত্র বেশি দেখা যায়। কারণ, তারা বাড়ি ভাড়ার ওপর নির্ভরশীল। অনেক সময় পুরনো ভাড়াটিয়া চলে গেলে নতুন ভাড়াটিয়া আসতে সময় নেয় বা ভাড়াটিয়া দেরিতে ভাড়া দিলে সমস্যা হয়। আর ব্যবসার উত্থান-পতন ও বর্তমান অর্থনৈতিক প্রেক্ষাপটে ব্যবসায়িক ব্যয় বৃদ্ধি এবং ব্যবসায় টার্নওভার কমে যাওয়ায় অনেক ক্ষেত্রে ব্যবসায়ীদেরও ঋণ পরিশোধ সক্ষমতা প্রভাবিত হয়। আবার এ মুহূর্তে দেশের অর্থনীতির আকার প্রত্যাশিত হারে বৃদ্ধি না পাওয়ায় কিছু চাকরিজীবী গ্রাহক চাকরি হারাচ্ছেন বা আয়ের অনিশ্চয়তায় পড়ছেন। তাদেরও ঋণ পরিশোধে সমস্যা হচ্ছে।
আবাসন ঋণের বাজারে নীতিগত প্রতিবন্ধকতাগুলো কী দেখেন?
হোম লোন সম্প্রসারণে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত ও কাঠামোগত প্রতিবন্ধকতা বিদ্যমান। ব্যাংক সাধারণত স্বল্পমেয়াদে আমানত সংগ্রহ করে, কিন্তু হোম লোনের মতো পণ্যে ১৫-২০ বছরের দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগ করতে হয়, ফলে তহবিল ব্যবস্থাপনায় ম্যাচিউরিটি মিসম্যাচ সৃষ্টি হয়। দেশে স্থায়ী সম্পদের মান নির্ধারণে মানসম্মত ও ইউনিফর্ম মেকানিজমের অভাব রয়েছে। অনেক সময় গ্রাহকের দাবি করা সম্পত্তির মূল্য এবং ব্যাংকের মূল্যায়নের মধ্যে বড় ব্যবধান থাকে, যা ঋণ অনুমোদনে বাধা সৃষ্টি করে। বাংলাদেশে জমি, ফ্ল্যাট বা বাড়ির রেজিস্ট্রেশন এবং মর্টগেজ রেজিস্ট্রেশন প্রক্রিয়া সময়সাপেক্ষ, জটিল ও ব্যয়বহুল, যা হোম লোন সম্প্রসারণকে ধীর করে দেয়। আর্থিক শিক্ষার অভাব একটি বড় প্রতিবন্ধকতা। অনেক গ্রাহক ঋণের সুদ, শর্তাবলি ও দীর্ঘমেয়াদি দায় সঠিকভাবে না বুঝে এবং যথাযথ বাজেট পরিকল্পনা ছাড়াই ঋণ গ্রহণ করেন। দেশে সেকেন্ডারি মর্টগেজ মার্কেটের অভাব থাকায় ব্যাংকগুলো হোম লোন রিফাইন্যান্স বা সিকিউরিটাইজেশনের মাধ্যমে পর্যাপ্ত তারল্য সৃষ্টি করতে পারে না। ফলে দীর্ঘমেয়াদি হোম লোন প্রদানে ব্যাংকগুলোর আগ্রহ তুলনামূলকভাবে কমে যায়। ঋণ আদায় ও দেউলিয়া আইন বাস্তবায়ন দুর্বল ও সময়সাপেক্ষ হওয়ায় ডিফল্টের ক্ষেত্রে সম্পত্তি জব্দ ও বিক্রির আইনি প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হয়, যার ফলে ব্যাংকের ঝুঁকি ও অনিশ্চয়তা উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পায়।
দেশে ডিজিটাল ল্যান্ড রেকর্ড ও সেন্ট্রাল প্রপার্টি ডেটাবেজের অভাব থাকার কারণে সম্পত্তির মালিকানা যাচাই, ডুপ্লিকেট টাইটেল শনাক্তকরণ এবং ফ্রড প্রতিরোধ কার্যকরভাবে করা কঠিন হয়ে পড়ে, যা হোম লোন সম্প্রসারণে অতিরিক্ত প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এছাড়া বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিশেষ করে নতুন শহর উন্নয়নের ক্ষেত্রে স্যাটেলাইট টাউন ও সবুজ শহর নির্মাণে সরকারকে বন্ড বাজার ও অন্যান্য দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন উৎসের মাধ্যমে তহবিল সংগ্রহের ব্যবস্থা করতে হবে।
আবাসন ঋণ পুরোটাই জামানতনির্ভর। এক্ষেত্রে ঋণ প্রক্রিয়া সম্পাদন করেন কীভাবে? গ্রাহকই-বা কতদিনের মধ্যে ঋণ পান?
সাধারণত গড়ে ১০ কার্যদিবসের মধ্যে অর্থছাড় করা হয়। অন্যান্য রিটেইল ঋণের তুলনায় এতে কিছুটা বেশি সময় লাগে, কারণ সম্পত্তির ভ্যালুয়েশন রিপোর্ট ও লিগ্যাল অপিনিয়ন তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে সংগ্রহ ও যাচাই করতে হয়, যা সময়সাপেক্ষ। গ্রাহকের প্রোফাইল অনুযায়ী মেয়াদ সর্বনিম্ন পাঁচ থেকে সর্বোচ্চ ২৫ বছর হয়ে থাকে। ঋণের সুদের হার অন্যান্য ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মতো পরিবর্তনশীল।
হোম লোনের পরিসীমা বৃদ্ধিসংক্রান্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক সিদ্ধান্ত বাজারে কতটা ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করেন?
কেন্দ্রীয় ব্যাংক কর্তৃক হোম লোনের সর্বোচ্চ সীমা ২-৪ কোটি টাকায় উন্নীত করা একটি সময়োপযোগী ও বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত, যা বাজারে সামগ্রিকভাবে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে বলে মনে করা যায়। বর্তমানে দেশে মাথাপিছু জমির পরিমাণ কমে যাওয়া, শহরাঞ্চলে জমির উচ্চমূল্য এবং নির্মাণ সামগ্রীর ক্রমাগত মূল্যবৃদ্ধির কারণে ফ্ল্যাটের দাম অনেকটা বৃদ্ধি পেয়েছে। এ প্রেক্ষাপটে হোম লোনের সীমা বৃদ্ধি ঋণের মাধ্যমে ঋণ পরিশোধে সক্ষম বা সামর্থ্য আছে এমন ব্যক্তিদের ফ্ল্যাট ক্রয়কে কিছুটা সহজ করবে। একই সঙ্গে নতুন নীতিমালা অনুযায়ী, যেসব ব্যাংকের মন্দ ঋণের হার তুলনামূলকভাবে কম, তারাই সর্বোচ্চ ৪ কোটি টাকার হোম লোন প্রদানের সুযোগ পাবে। ফলে ব্যাংকগুলো সম্পদের গুণমান এবং ক্রেডিট শৃঙ্খলা বজায় রাখতে আরো সচেতন হবে, যা ব্যাংক খাতের সামগ্রিক স্থিতিশীলতাকে উৎসাহিত করবে। এছাড়া এ সিদ্ধান্তের ফলে ব্যাংকযোগ্য ক্রেতার সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে, রিয়েল এস্টেট খাতে জমে থাকা অবিক্রীত ফ্ল্যাটের বিক্রয় বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে এবং ডেভেলপারদের নগদ প্রবাহ পরিস্থিতিতে কিছুটা স্বস্তি আসবে। সেক্ষেত্রে ফ্ল্যাটের দাম কমারও সম্ভাবনা থাকে।
i-Banking